জীবন নামের খেয়া (গল্পগ্রন্থ)

January 23, 2025
জীবন নামের খেয়া
মুহাঃ মোশাররফ হোসেন
লেখক পরিচিতিঃ
মুহাঃ মোশাররফ হোসেন ১৯৮২ খৃষ্টাব্দের ১লা ডিসেম্বর, বাংলা ১৩৮৯ সালের ১৫ই অগ্রহায়ন রোজ বুধবার যশোর জেলার মনিরামপুর থানার অন্তর্গত ঝাঁপা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তাহার পিতা মৌলভী আজহারুল ইসলাম। তিনি একই গ্রামে ঝাঁপা আলিম মাদ্রাসার মৌলভী শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি একাধিক বই রচনা করেন। মাতাঃ মৃতঃ গফুরুননেছা, পেশায় গৃহিনী।
৩ বোন এবং ৪ ভায়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ট। ভাইদের মধ্যে ছিলেন সবার ছোট।
ঝাঁপা পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরু করলেও পিতার ইচ্ছা অনুযায়ী পিতার কর্মস্থল ঝাঁপা আলিম মাদ্রাসায় ২য় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পরবর্তীতে কাশিপুর পীরবাড়ি সিদ্দিকিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি হয় এবং ১৯৯৭ খৃষ্টাব্দে দাখিল পরীক্ষায় ১ম বিভাগে পাশ করেন।
পরবর্তীতে মনিরামপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হলেও পিতার নির্দেশে পুনারয় ঝাঁপা আলিম মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তি হয়ে ১৯৯৯খৃষ্টাব্দে আলিম পাশ করার পর খেদাপাড়া ফাযিল মাদ্রাসায় ফাযিলে ভর্তি হলেও সংসারের দায়িত্ব কাঁধে আসায় পড়াশুনা চলমান রাখতে পারে নাই।
কর্মজীবনে পারিবারিক ব্যাবসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে লেখালেখি শুরু করেন।  বর্তমানে তিনি নিউজবিডিজার্নালিস্ট২৪ (অনলাইন মিডিয়া) এর প্রকাশক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সাথে তিনি লেখা-লেখির ময়দানেও অনেকটা এগিয়ে চলেছেন।

লেখকের কথাঃ

মহান রবের দরবারে শুকরিয়া। অমর একুশে গ্রন্থমেলা -২০২৫ উপলক্ষ্যে প্রাণের মেলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমার রচিত ‘জীবন নামের খেয়া’ গল্পগ্রন্থটি প্রকাশ পেয়েছে। গ্রন্থটি কাল্পনিক একটি ঘটনা কল্পনায় এঁকে তা মলাট বন্দী করবার প্রয়াস মাত্র আমার। আশা করি গ্রন্থটিতে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে যা পাঠক পাঠে অনুভব করতে বাস্তব জীবনের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা ও মধুর সময়ের ঘটনাবলী। আমি বিশ্বাস করি পাঠকগণ মুগ্ধ হবে এবং ভালো লাগবে। আর পাঠকের ভালো লাগলে লেখকের আরো লেখার প্রতি অনুপ্রেরণা যোগায়।

আমার ইতোপুর্বে বেশ কয়েকটি সংকলন প্রকাশ হয়েছে তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য, ‘ইতিহাসের পাতায় যশোর, “ভাগ্যের লিখন” (কাব্য গ্রন্থ), যৌথ কাব্য গ্রন্থ” শত কবিতার সমাহার, আলোর মশাল, ছুঁয়ে দাও কল্পনায়, এছাড়া যৌথগ্রন্থ “গল্পে গল্পে হারিয়ে যাবো”। এবং এককভাবে “শিক্ষনীয় তিন গল্প” ছাড়াও আরো অনেকগুলো পান্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

উৎসর্গঃ
 বইটি আমার মরহুম পিতাঃ আজহারুল ইসলাম, মাতাঃ মোছাঃ গফুরুননেছা, পিতার সমতুল্য আমার শ্রদ্ধেয় দুলাভাই আলহাজ্ব হাফিজুর রহমান,  বোন হাসিনা পারভীন, সহধর্মিণী মোছাঃ তৃপ্তি খাতুন, কন্যা মোছাঃ তিশা খাতুন এবং পুত্র মোঃ ফয়সাল কবির (শাওন) ও মাহিম আহম্মেদ এর নামে উৎসর্গ করলাম।
প্রথম পরিচ্ছেদঃ
শরিফ একটা সহজ, সরল, সামাজিক এবং উদার মনের মানুষ। দায়িত্ব কর্তব্যতেও তার কোনো ঘাটতি নেই। শরিফ লেখাপড়ায় খুব ভালো, দায়িত্ব মানবতা ও কর্তব্যের মায়াজালে সে নিজেকে সর্বদা বিলিয়ে দেওয়ার জন্য লেখাপড়া শেষ নামাতে পারে নাই। শরিফের বাবা একজন সহজ সরল মানুষ ও মাদ্রাসার শিক্ষক। সততার জন্য নিজেকে কখনো কারোর কাছে বিক্রি করেনি। ঠিক শরিফ তার পিতার আদর্শ বুকে ধরে নিজেকে গড়ার চেষ্টায় সর্বদা থাকে। শরিফ মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতো, লেখাপড়ায়ও ভালো ছিলো। শরিফ ক্লাস নাইনে যখন পড়তো, তখন একই ক্লাসের একটা মেয়ে নাম তার সুফিয়া মন থেকে তার আচরণে মুগ্ধ হয়ে ভালো বেসে ফেলে। শরিফ বিষয়টি জেনেও না জানার ভাণ করে থাকে, কারন শরিফ ছোট্ট বেলা থেকে রুববান নামে একটা মেয়েকে পছন্দ করে এবং ভালোবাসে, কিন্তু তাকে কোনোদিন বলতে পারনি। সেই মেয়েকে পছন্দের কারনে সুফিয়াকে কোনোদিন প্রশ্রায় দেইনি। শরিফ মাদ্রাসার পাশে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে লজিং থাকতো।
হঠাৎ একদিন শরিফ মাদ্রাসা থেকে লজিং যাওয়ার পথে শরিফের বন্ধু ফারুখ, কিছু বকাটে লোক নিয়ে ক্লাসে লেখাপড়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতার জের ধরে শত্রুতা করে শরিফকে আক্রমণ করে, কিন্তু শরিফের আত্মীয়ের বাড়ি ছিলো মাদ্রাসার পাশে, এখবর তারা জানতে পেরে ঘটনা স্থলে ছুটে চলে আসে। ঐদিন শরিফ এই বকাটে লোকদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। শরিফের লজিংম্যানের বাজারে ব্যাবসা ছিলো, মাঝে মধ্যে শরিফ সেই ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে যেয়ে বসতো, শরিফের লজিংম্যান খুব ভালো এবং ধার্মিক লোক ছিলো, শরিফকে খুব ভক্তি করতো। শরিফ সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার বাড়ি যেতো, আর শুক্রবার বিকালে লজিং এ উপস্থিত হতো।
শরিফ নিজ মাদ্রাসার শিক্ষক বাদ দিয়ে অন্যাত্রে এক শিক্ষকের নিকট প্রাইভেট পড়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিলো এবং সেখানে পড়াও শুরু করলো। সুফিয়া, শরিফ যেখানে প্রাইভেট পড়ে সেখানে আরও কিছু বান্ধবী নিয়ে প্রাইভেট পড়তে আসা শুরু করলো। যতই শরিফ সুফিয়াকে এড়িয়ে চলে ততই সুফিয়া তার পিছে লাগে, কোনো প্রকার সুফিয়াকে এড়াতে পারেনা, এভাবে চলতে থাকে তাদের লেখাপড়া।
একদা শরিফ প্রাইভেট পড়ে লজিংয়ের উদ্যশ্যে রওনা দিলো, হঠাৎ সুফিয়া শরিফের সাথে দেখা করার জন্য প্রতিমধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। শরিফ এবং সাথে এক বন্ধু নাম মহসিন, শরিফ এবং মহসিন যখন রাস্তায় যাচ্ছে তখন দেখতে পেলো কে যেনো দাড়িয়ে আছে। কাছে এসে দেখে সে আর কেউনা সুফিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
শরিফ—-কি খবর সুফিয়া তুমি এখানে কেনো দাঁড়িয়ে আছো?
সুফিয়া—–আমি তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি।
শরিফ—–কেনো কি হয়েছে?
সুফিয়া ——– কিছু হয়নি তবে আমি তোমার সাথে একান্ত কিছু বলতে চায়।
শরিফ ——কি বলবে?
সুফিয়া——আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি এবং ভালোবাসি, সেটা তুমি কি জানোনা?
শরিফ—-জেনেও না জানার ভান করে বললো, না আমিতো জানিনা বা জানার প্রয়োজন মনে করিনা, কারন আমার বাবা খুব গরীব, আমাকে লেখপড়া করার জন্য পাঠিয়েছে প্রেম ভালোবাসার জন্য নয়।
সুফিয়া ——– মনের কষ্ট মনে রেখে বললো ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি তবে আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো।
শরিফ দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলো এবং ফাস্ট ক্লাস পেয়ে পাশ করলো। শরিফ এবার মাদ্রাসায় পড়ালেখার চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়ে বাবার মতের বিরুদ্ধে যেয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো, এবং কলেজে ভর্তিও হলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ঠিক যখন পরীক্ষার সময় আগত, হঠাৎ শরিফের বাবার সিদ্ধান্তে পুনারয় মাদ্রাসায় আলিম ভর্তি হলো। সামনে আলিম পরীক্ষার  অল্প সময়। এদিকে পরীক্ষার কিছুদিন আগেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে পড়ে, যার ফলে ভালো রেজাল্ট করতে পারলোনা। এবার শরিফের লেখাপড়ার ঘুণ ধরলো। এর পরে শরিফ ফাজিল ভর্তি হলো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত  সংসারের দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে আর লেখাপড়া শেষ নামাতে পারলোনা।
সংসারের নিত্য খরচ যোগান দিতে খুবই কষ্ট পেতে হতো শরিফের। শরিফ মাঠে আমলা দিতে পারতোনা। কিভাবে খরচ যোগান দিবে তা নিয়ে ভাবতে থাকে, হটাৎ সে চিন্তা করলো ব্যাবসা করার, এবং ভাই বোনদের সাথে পরামর্শও করলো। সবাই শরিফের কথায় আমলে নিয়ে ব্যাবসা করার পরামর্শ দিলো। এক পর্যায় শরিফ ছোট একটা ব্যাবসা শুরু করলো, কিন্তু তাহাতে যে ব্যাবসা হয় তাতে শরিফের সংসার বেশি ভালো চলেনা। তার পরেও শরিফ ব্যাবসা চালাতে থাকে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদঃ
 শরিফের মা-বাবা দুই জনই বৃদ্ধ, বাবার চাকরি শেষে খুব অসহায় ভাবে জীবন জাপন করে। শরিফ বাবা মায়ের খেদমতে সর্বদা ব্যাস্ত থাকতেন। কোনো সময় তাদের কষ্ট দিতেননা। শরিফ যে ব্যাবসা করে, তাহাতে যে ব্যাবসা হয় কোনো রকম খেয়ে পরে চলে। এর মধ্যে শরিফের বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসা করাতে খুব অসহায় হয়ে পড়ে শরিফ। পরবর্তীতে শরিফের এক বোন সহযোগিতা করে চিকিৎসা করাতে থাকে, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! শরিফের বাবাকে আর বাঁচাতে পারেনা, আল্লাহর ডাকে পরোপারে পাড়ি দেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
এর পরে শুরু হলো শরিফের নতুন জীবন, শরিফ যে ব্যাবসা করে, তাতে ভালো উপার্জন হয়না, দিন আনতে পান্তা পুরায়। শরিফ বাবার চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ করেছে ঐ ব্যাবসা থেকে। যেহেতু ব্যাবসায় মুলধণ অল্প, তার পরে আবার বাবার পিছনে খরচ। এসব নিয়ে শরিফ সর্বদা চিন্তামগ্ন থাকে। আল্লাহর উপর ভরসা করে চলতে থাকে এবং মনে মনে ভাবে হয়ত একদিন অবশ্যয় ভালো কিছু হবে।
হঠাৎ একদিন শরিফের পছন্দের মেয়ে রুববানের সাথে দেখা, রুববান  দোকানে আসলো এবং বহু সময় গল্প করে বাড়ি চলে গেলো শরিফ তখনও বুঝতে দিলোনা যে তাকে শরিফ পছন্দ করে। শরিফ রুববানদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে যাতায়াত করে। রুববানের বাবা-মাও শরিফকে খুব ভক্তি করে। রুববান পড়াশোনা করতে বাড়ির বাহিরে চলে যায় এবং কলেজের হোস্টেলে থাকে। শরিফ রুববানের সর্বদা খোজ খবর নিয়ে থাকে। রুববান শরিফের এই ভক্তি, দায়িত্ব, কর্তব্য দেখে মুগ্ধ, তবে সে কখনো বুঝে উঠতে পারেনা শরিফ তাকে পছন্দ করে এমনকি জীবনসঙ্গী করতে চায়। এভাবে শরিফ এবং রুববানের চলাফেরা চলতে থাকে, গ্রামের লোকে বিষয়টি জানে এরা ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে চলাফেরা করে।
    তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ
কিছুদিন পরে হঠাৎ একদিন সুফিয়ার সাথে দেখা, সুফিয়া এখনো মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। সুফিয়া এখনো শরিফকে ভালো বাসে। সন্ধান পেয়েছে শরিফ ব্যাবসা করে, এবং সন্ধান নিয়ে দেখা করতে আসে দোকানে। সুফিয়া মনোকষ্ট আর আবেগভরা মন নিয়ে শরিফের সামনে বসা, কি যেনো বলতে ইচ্ছুক কিন্তু বলতে সাহস পাচ্ছেনা। শরিফ সুফিয়ার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করলো কিছু বলবে সুফিয়া?
উত্তরে সুফিয়া ——– কি আর বলবো মুখে বলার সাহস নেই তার পরেও আসলাম তোমার সাথে দেখা করতে।
শরিফ ——– তা তোমার কি বিয়ে হয়েছে, আর স্বামী কি করে?
সুফিয়া ——– বিয়ে! সে কপাল কি আমার আছে? যার জন্য সারাটা জীবন অপেক্ষায় থাকলাম সেই আমাকে চেনেনা! তবে বাবা-মা যেখানে বিয়ে দিবে সেখানেই বিয়ে করবো এবার। এই বলেই সুফিয়া স্থান ত্যাগ করলো। কিছুদিন পরে শরিফ শুনলো সুফিয়ার বাবা বিয়ে দিয়েছে মাদ্রাসায় চাকরি করা এক ছেলের সাথে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস যাকে পছন্দ করে হৃদয়ের ভিতরে যায়গা করে নিলো তাকে না পেয়ে অন্যাত্রে বিয়ে করে সংসার করতে হচ্ছে। না পাওয়ার বেদনা বুকে নিয়ে, মনের কষ্ট মনে জমা রেখে স্বামীকে আপন করে সংসার করে। কি আর করবে সবই ভাগ্যের খেলা, মেনে নিতে হবে এটাই স্বাভাবিক, সুফিয়া মনে মনে ভাবলো হয়ত আমার ভালোবাসার কোনো ঘাটতি আছে তাই পেলামনা, যাহা পেয়েছি তাহা আপন করে নিয়ে সংসার করি, সুফিয়া তাই করলো এবং সব কষ্ট ভুলে সংসারে মনোনিবেশ করলো।
 চতুর্থ পরিচ্ছেদঃ
শরিফ ব্যাবসা বানিজ্য নিয়মিত করতে থাকে, পাশাপাশি সামাজিক কাজ কর্মেও সময় দেই। সমাজে শরিফের যথেষ্ঠ সুনাম আছে,  আর থাকবেও বা না কেনো? বাবার আদর্শ নিয়েতো গড়া শরিফ তাই এই সুনাম। শরিফের মাও বৃদ্ধ তেমন কাজ কর্ম করতে পারেনা, শরিফের সাথে থাকে এক ভাই সেও ভালো একটা কাজ কর্ম করেনা। একেতো ভাই প্রাই অক্ষম তার পরে আবার ভায়ের বৌ, সব সামলিয়ে শরিফ সংসারের দায়িত্ব পালন করতে থাকে। এদিকে শরিফের মা বৃদ্ধ, মায়ের ইচ্ছা শরিফকে বিয়ে দিয়ে বৌমার হাতের খেয়ে যেনো বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে।
শরিফের বিয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ মেয়ে দেখাশোনা করতে থাকে। হঠাৎ শরিফের এক ভাই” রুববানের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায়, কিন্তু শরিফ এ বিষয়ে কিছু জানেনা, আর জানলেও না জানার ভান করে আছে। রুববানের বাড়ি থেকে প্রস্তাব পেয়ে হাস্যকর হিসাবে তুচ্ছায় করে বলে এটা সম্ভাবনা! কারন এরা দুইজন ভালো বন্ধু সেই হিসাবে আমরা দেখি এর বাইরে না। রুববান! শরিফের নিকট এই প্রস্তাবের কথা জিজ্ঞাসা করিলে শরিফ এড়িয়ে যায়, কারন হারানোর ভয়ে! শরিফ বলার পরে যদি রুববান কথা না বলে কিংবা স্বার্থপর মনে করে তার জন্য।
শরিফের বিয়ে নিয়ে বাড়ির কর্তৃপক্ষ মেয়ে দেখাশোনা করতে আবার মরিয়া হয়ে ওঠে। রুববানের বাড়ির কর্তৃপক্ষও রুববানের বিয়ের জন্য ছেলে দেখতে শুরু করে। শরিফের বিয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ মেয়ে ঠিক বিয়ের দিনও ধার্য্য করে ফেললো। এরই মধ্যে হঠাৎ শরিফের কানে সংবাদ এলো রুববানের বিয়ের জন্য ছেলে ঠিক করা হয়েছে এবং রাতেই বিয়ে। যথা সময়ে রুববানের বিয়ে রাতেই হয়ে গেলো এবং শরিফের বিয়ের আগেই হলো। এই বিয়েতে রুববানের বাড়ি থেকে শরিফের দাওয়াতও করলো, কিন্তু নিয়তির খেলা শরিফ ঐ দিন বাড়ি না থাকায় শরিফের ভাইকে দাওয়াতে শরিক হওয়ার জন্য অনুরোধ করিলে শরিফের ভাই বিয়ের দাওয়াত খেয়ে আসলো। হায়রে নিয়তি শরিফ মনে প্রাণে ভালোবাসে আজ সেই বিয়েতেও হাজির হতে পারলোনা, সবই হয়ত আল্লাহর লীলাখেলা। রুববানের স্বামী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষীত কিন্তু দেখতে সুশ্রীমান নয়। রুববান স্বামীকে নিয়ে সুখি শান্তিতে সংসার করতে লাগলো।
   পঞ্চম পরিচ্ছদঃ
  শরিফের বিয়ের জন্য মেয়ে ঠিক হয়, আর এই বিয়ের জন্য ঘটক থাকে শরিফের বন্ধু। এর মধ্যে মেয়ে কিন্তু শরিফের বন্ধুর দূঃসম্পর্কের ভাইজি এ কথা শরিফ জানেনা বা জানাইওনি শরিফের বন্ধু। বিয়ের দিন ঠিক হওয়ার পরে এ ঘটনা শরিফ জানতে পারে। সে মেয়েও সুন্দরী এবং নাম রোজিনা তবে শিক্ষা দীক্ষায় কম। মেয়ে সবে মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিবে। শরিফের বিয়ের দিন ধীরে ধীরে প্রায় নিকটে চলে আসে। শরিফের ভাই একটা দেশের বাইরে থাকে, আর সেই ভাই শরিফের বিয়ের খরচ দেই। শরিফ সংসারের দায়িত্ব পালন করে, তার আর কেউ নেই যে সে বিয়ের দায়িত্ব নিবে, তাই শরিফ নিজেই নিজ বিয়ের দায়িত্ব পালন করে মার্কেটিং থেকে শুরু করে সব নিজে সামলায়ে বিয়ের কাজ সমাপ্তি করলো। বিয়ে খুব ধুম-ধামে হলো, এলাকায় এত বড় আয়োজন আর কারোর হয়নি।
  কথায় বলে কপাল যদি হয় ফাঁকা তবে ঘুরতেও পারে ভাগ্যের চাকা। সেই কথা শরিফের ভাগ্যে মিলে যায়, শরিফের শ্বশুর পূরানো ধনী, সেখান থেকে সহযোগিতা পেতে থাকে। আসলে পানিতে পানি দিলে যেমন বাড়ে, তেমনি উঠতি সংসারে সহযোগিতা পেয়ে শরিফের সংসার ফুলে ফলে ভরে যায়। আস্তে আস্তে শরিফ আল্লাহর রহমতে আলোর সন্ধান পেয়ে সিড়ি বয়ে শরিফ উপরে উঠতে থাকে। বাস্তব সত্য এই সমাজে ভালোভাবে, সাদা পোষাকে চলাটা কেউ পছন্দ করেনা, শরিফ হয়ে পড়ে সমাজের কাছে চক্ষুশুল। এতে শরিফের ভাই বোনেরাও হিংসা করতে থাকে তবে শরিফের আছে মা-বাবার দোয়া, তাই শরিফকে কেউ সহজে দমিয়ে রাখতে পারেনা। যেমন কর্ম তেমন ফল, কথাটা অতি বাস্তব।  আলেম ওলামাদের মুখে শুনেছি জলে স্থলে যাহা কিছু ঘটে সবই দুই হাতের কর্মের ফসল। শরিফ বাবা-মা, আত্মীয় স্বজন, তথা সামাজিক ভাবে দায়িত্ব কর্তব্যে কার্পন্যতা করেনা তাই হয়ত আল্লাহ এমন কাজ জুটিয়ে দিয়েছে। যার ফলে শরিফের সংসার নুন আনতে পান্তা এমন দিন থেকে আল্লাহ সফলতা লাভ করিয়েছেন।
     ষষ্ঠ পরিচ্ছেদঃ
শরিফের মা বৃদ্ধা, সংসারে কাজ তেমন করতে পারেনা। সব শরিফের স্ত্রী রোজিনা করে। শরিফ রোজিনার কাজে সাহায্য করে। শরিফ সহজ সরল সাদা মনের মানুষ এবং কোনো অর্থের লোভ তার ভিতর নাই। সব সময় মনে করত সাধারন ভাবে চলে আল্লাহর রহমতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকলেই হবে। নিয়তির খেলা! শরিফের বাবার তেমন অর্থ সম্পদ নেই যে সেখান থেকে কিছু করবে। শরিফ সংসার এবং আত্মীয় স্বজন, বাব-মায়ের খদমত করতে যেয়ে ভালো কিছু করতে পারেনাই।
বিয়ের পরে শরিফের নতুন জীবন শুরু হয় এবং তার চোখ খুলে যায়। এজীবনে কিছু করতে পারেনি, বাকি জীবন অর্থাৎ শরিফের সন্তানদের জন্য কিছু করতে হবে এই ভাবনাটা চলে আসে মাথায়। শরিফ শ্বশুর বাড়ি থেকে সহযোগিতা পায় এবং নিজ চেষ্টা করতে থাকে, আল্লাহর রহমতে শরিফ আশার আলো দেখতে পায়। শরিফের ব্যাবসা ভালো না হওয়াই এবং ব্যাবসার অনেক টাকা মার্কেটে বাকি পড়ে থাকার কারনে শরিফ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়। পরবর্তীতে শরিফ ব্যাবসা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই এবং বন্ধ করে দেই। শরিফ হয়ে যায় বেকার, বেকার জীবন খুব কষ্টের সেটা শরিফ হাড়ে হাড়ে টের পায়। শরিফের স্ত্রী এবং শরিফ নিজে খুব কষ্টে সংসারের হাল ধরে রাখে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এভাবে দুইজন মিলে কষ্ট ভাগাভাগি করে সংসার চালায়।
 শরিফের মনোবল” বা-বাবার দোয়া থাকলে আল্লাহর রহমতে সব বিপদ পার হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। যেহেতু শরিফ মা-বাবার খেদমত করেছে সেহেতু তার মনে প্রাণে বিশ্বাষ আছে তাদের দোয়ার বরকতে আর আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহই সব সমাস্যার সমাধান করে দেন আর কর্ম যদি ভালো থাকে অবশ্যই সুফল হয়। শরিফের কর্মের ফলে এবং মা-বাবার দোয়াই ভাগ্য পরিবর্তন হলো, কথায় বলে সাধনার ফল সুমিষ্ট হয়। শরিফ একটা কোম্পানিতে চাকরি পেলো এবং শরিফ ও রোজিনা আবার সংসার গুছিয়ে ফেললো।
 সপ্তম পরিচ্ছেদঃ
 ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! কিছুদিন পরে শরিফের মা হটাৎ অসুস্থ হয়ে অনেক বড় রোগে আক্রান্ত হলো। চিকিৎসা করতে অনেক খরচ, শরিফ চিন্তায় ভেঙ্গে পড়ে। তার পরে শরিফ সবার সহযোগিতা নিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাতে লাগলো। এর মধ্যে শরিফের স্ত্রী রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন থাকে। হায়রে নিয়তি!  একেতো মা অসুস্থ তার পরে শরিফের স্ত্রী হাসপাতালে ভর্তি, শরিফ দুই দিকে দেখতে যেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। শরিফ রোজিনাকে নিয়ে হাসপাতালে, হঠাৎ সংবাদ আসে শরিফের মায়ের শারিরীক অবস্থার অবনতি। শরিফ সংবাদ পেয়ে বাড়ি আসলো, বহু চিকিৎসা করানোর পরেও মাকে আর বাঁচাতে পারলোনা, আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরোপারে পাড়ি দিয়ে চলে গেলেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সব’ই আল্লাহর লীলা খেলা” শরিফের স্ত্রী রোজিনা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকে আর শরিফের মা মৃত্যুবরন করে, এ কষ্ট শরিফের জন্য খুবই বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। সারা বছর খেদমত করলো দুইজন মিলে আর আজ শরিফের স্ত্রীর সাথে দেখা মিললোনা শরিফের মায়ের! খুববই কষ্ট আর বেদনা নিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে শরিফ মায়ের দাফন শেষ করলো।
(সমাপ্তি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *